Tuesday, 20 September 2022

আমার শৈশব (ধারাবাহিক) পর্ব ৩ নৌকা ভ্রমণ

 আমার শৈশব

(ধারাবাহিক)

পর্ব ৩

নৌকা ভ্রমণ

 


আগের লিঙ্কঃ

Blog:

https://aakashgang.blogspot.com/2022/09/blog-post_20.html

Facebook:

https://www.facebook.com/photo/?fbid=5417813418297127&set=a.152509728160882


আগের পর্বে লিখেছি যে, আমার ঠাকুরদারা ছিলেন ছয় ভাই। সেই অনেক কালের কথা। আগে একান্নবর্তী পরিবারভুক্ত ছিলেন পরে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু প্রানের টান তাতে একটুও কমেনি। বারো মাসে তেরো পার্বণে দেখা সাক্ষাৎ হত মানে আমাদের এখনকার গেট টুগেদার পার্টি আর কি! তবে এখনকার মত তো আর থাকা খাওয়ার অত সমস্যা ছিল না তাই সেই উপলক্ষে দিন কতক বেড়ানোও হয়ে যেত।

 

নদীমাতৃক দেশ। যানবাহনের বেশীর ভাগই ছিল জলযান। খালে বিলে ঘুরে বেড়াতে তালের ডিঙার জুড়ি মেলা ভার। ছোটদের খুব প্রিয় তবে বেয়ে যেতে বেশ দক্ষতার প্রয়োজন হত। অগভীর জলে চলত আর সবাই সাঁতার জানতো বলে খুব একটা ভয়ের কিছু ছিল না। বর্ষাকালে মাঠে ঘাটে জল জমে গেলে এই ডিঙাই ছিল মুশকিল আসান।

 

আর এমনি ছোট ছোট নৌকা প্রায় সবার ঘাটেই বাঁধা থাকতো। তালের ডিঙা যদি হয় ডাঙার সাইকেল তবে ছোট নৌকাগুলো হল মোটর সাইকেল। বড় নদীতে এইসব নৌকা নিয়ে চলাচল করা যেত না। সেখানে দরকার হত আরও বড় নৌকা পানসী বা বজরা এই সব ধরনের নৌকা।

 

আমরা থাকতাম শহরে। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে কিছুটা পথ নৌকা করে যেতেই হত। বেশ ছোট তখন আমি। ভান্ডারিয়ার দাদুর বাড়ি থেকে অন্য ফরিদপুরের ফাঁসিয়াতলায় তিন দাদুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ঠিক হল কয়েক দিনের জন্য। আমার ছোট ঠাকুরদার ছিল একটা মস্ত গয়নার নৌকা। মা ও ছোট ঠাকুরদার কাছে শুধু শুনেছিলাম যে গয়নার নৌকাতে আমরা পাঁচ দিন ধরে চলে সেই তিন ঠাকুরদাদের বাড়ি পৌঁছাবো।

 

অল্প অল্প মনে পড়ছে সেই নৌকা এত বড় ছিল যে তাতে একশ মণ ধান চাপানো যেত। যাহোক, মায়ের সাথে আমরা দুভাই বোন, এক পিসী, ছোট ঠাকুমা আর দাদু সহ আমরা চাপলাম। মাঝে মাঝে মাঝি মাল্লারা বিশ্রাম নিতে নোঙ্গর ফেলত। আর এই নৌকার সাথে একটা ছোট নৌকা মোটা কাছি দিয়ে বাঁধা থাকতো সেটাতে রান্না হত আর কোনও বন্দরের পাশ দিয়ে গেলে সওদা আনার কাজে তা লাগত। গয়নার নৌকার একটা অংশের সাথে মই লাগানো থাকতো সেই ছোট নৌকাতে নামার জন্য। আসলে ছোট বলছি -কিন্তু সেখানে রান্না-বান্না ছাড়াও বদলি মাল্লারা জিরিয়ে নিতেন নইলে টানা পাঁচদিন নৌকা বাওয়া তো সম্ভব নয়।

 

তখন তো সব কিছুই এলাহি ব্যপার স্যাপার। রান্নার বাসন পত্র ধোয়ার কাজে সেই ছোট নৌকাই ভরসা। মনে পড়ে, আমরা স্নান ও করেছি সেখানে বালতি ভরে নদী থেকে জল তুলে। মায়েদের স্নান করার সময় ওনারা কেউ নৌকাতে থাকতেন না।

 


সারাদিন নৌকা চলত। সন্ধ্যার আগেই কোনও একটা লোকালয়ের কাছে এসে নোঙ্গর পড়ত। বাজার করে রান্নার আয়োজন। কি কি রান্না হত কিছুই মনে নেই এখন আর। লণ্ঠনের আলোয় ঢুলু ঢুলু চোখে খেয়ে দেয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়তাম আর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙতেই দেখতাম যে নৌকা চলছে। নৌকার ছই এত বড় ছিল যে অনায়সে আমাদের এতগুলো লোকের জায়গা হয়ে যেত।

 

আমার মনে নেই দু দিন চলার পর তিনদিনের মাথায় একটা বড় নদী পাড়ি দিল আমাদের গয়না। দাড়ে গিয়ে বসলেন যিনি তাঁর মুখে প্রথম বদর বদর শুনলাম। মাকে জিজ্ঞাসা করতেই ঠাকুমা বললেন যে পীর উনি। মানে নদীর দেবতা ওনার নামে পাড়ি দিলে কোনও ভয় থাকে না। সারাদিন নৌকা পাড়িই দিল পথ আর শেষ হয়না! বড় হয়ে জেনেছিলাম যে সেই নদী আসলে পদ্মা নদী। পাড়ি দেয়ার সময় ছোট নৌকায় সেদিন আর কোনও রান্না হয়নি। চিড়ে মুড়ি খেয়ে দুপুরবেলা কেটে গিয়েছিল। সেদিন আর নৌকা চলেনি। সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিলেন দাদু সবাইকে আর আমাদের নিয়ে ডাঙায় নামলেন। বাজার ঘুরে দাদুর সাথে কেনাকাটা করলাম। নৌকাতে ফিরে এসে দেখি অন্য একটা নৌকা গয়নার সাথে বাঁধা। ওপরে উঠে দেখি তাঁতের শাড়ি, গামছা আর লুঙ্গি বিক্রি করতে এসেছে। ঠাকুমা আমায় একটা ছোট্ট শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন আর সেই শাড়ি পড়ে বন্ধুদের দেখিয়ে খুব মজা পেয়েছিলাম।

 

চতুর্থ দিনে দেখলাম গুন টানতে। মাল্লার নৌকার সাথে কাছি বেঁধে নদীর পাড় বরাবর হেঁটে নৌকাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যপার স্রোতের বিপরীতে হাঁটা যে!

আসলে এখন তো আমরা নিমেষে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করে বেড়াতে পারি কিন্তু আমি বলছি কয়েক দশক আগের কথা! তখন দুরত্ব অতিক্রম করাটা কষ্টসাধ্য থাকলেও পথে নিরাপত্তা ছিল। আর এখন নিজের বাড়িতেও আমরা কেউ নিরাপদ নই। সেদিন আর নৌকা চলল না। বিশ্রাম। পরেরদিন আরও একবেলা নৌকা ভ্রমণ করে আমরা ফাঁসিয়াতলার বাড়িতে পৌঁছালাম। কিন্তু, সেই পাঁচদিনের গয়নার নৌকার স্মৃতি এখনও আমার সুখস্মৃতির অন্যতম হয়ে আছে।



ছবি পরিচিতিঃ সঙ্গের ছবি দুটি বাবার তোলা এবং বাবার নিজস্ব তৈরি করা ডার্ক রুমে এনলার্জ করা। এনলার্জটাও বাবার নিজস্ব ভাবনায় নিজের হাতে তৈরি। ছবিটি রামকৃষ্ণ মিশন রোডের কোয়াটারের ব্যালকনীতে তোলা। পরনে দেশ থেকে পাঠানো শাড়ি। ফটোর এ্যালবাম গুলোও বাবার হাতে তৈরি। ছবির পাশে সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখে রাখতেন। সেখানে আমার ছোট বেলার ছবির গায়ে লেখা রয়েছে যে তখন আমার বয়স বছর মাস। দ্বিতীয় ছবিটি একটি বজরা ছবি। বুড়ি গঙ্গা নদীতে। বাবার হাতের লেখা দেখা যাচ্ছে।

(ক্রমশ)

 স্বাতী - ৩১ শে জুলাই ২০১৫






আমার শৈশব (ধারাবাহিক) পর্ব ২ বিক্রমপুরের কথা

 

আমার শৈশব

(ধারাবাহিক)

পর্ব ২

বিক্রমপুরের কথা

আগের লিঙ্কঃ https://aakashgang.blogspot.com/2022/09/blog-post.html





বছরে আমরা তিনবার অন্তত আত্মীয় স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। তার মধ্যে নিজেদের দেশের বাড়ি, মামা বাড়ি অন্যতম। তার বাইরে যেতাম, কাথুরা নামে আরেক যায়গায়।

আমার বাবা খুব ছোট বয়েসে পিতৃ-মাতৃহীন হয়েছিলেন। আমার ছিলেন ছয় ঠাকুরদা আর বাবারা তিন ভাই ও তিন বোন। আদি বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বেজগাঁ গ্রামে। নিজের ঠাকুরদা ও ঠাকুরমার অবর্তমানে বাবা ও ছোট কাকুকে প্রতিপালন করেন আমার ছোট ঠাকুরদা। মেজ কাকা ও ছোট পিসিমা রইলেন তাঁদের মামা বাড়ি দিঘলীতে। বাকি দুই পিসিমা প্রতিপালিত হলেন অন্য ঠাকুরদার কাছে।

বেজগাঁতে ছয় ঠাকুরদাদের প্রধান জীবিকা ছিল চাষ এবং দুগ্ধজাত সামগ্রীর ব্যবসা। পদ্মার ভাঙনে বহু চাষের জমি পদ্মা গর্ভে বিলীন হবার ফলে ঠাকুরদারা বিভিন্ন অঞ্চলে জীবিকার সন্ধানে ছড়িয়ে গেলেন। ছোট ঠাকুরদা গেলেন বরিশাল জেলার দক্ষিনে ভান্ডারিয়াতে। বড় ঠাকুরদা সহ আরও দুজন গেলেন ফরিদপুর , আরেকজন বরিশালের ভাটিখানায় আর অন্যজন আসামে।

আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন সেই বেজগাঁতে আমাদের ভিটে বাড়িতে। বর্ষাকালের জলের থেকে রক্ষা পেতে প্রায় বিঘে খানিক জমি ফুট আস্টেক মাটি দিয়ে উঁচু করে তারপর ঘর তোলা হয়েছিল।

বাবা যখন এখান থেকে চলে যান, তখন একটা আম গাছ পুঁতেছিলেন, সেই আম গাছটি তখন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। যেহেতু ভিটে বাড়ি বিক্রি করা হয়নি, সেহেতু ওখানে কেউ ছিলেন না। শুধু মাত্র এক গরিব চাষি ভাই ছিলেন বংশ পরাম্পরায়। তিনিই গাছ থেকে আম পেড়ে বাবাকে দিলেন। খুব আবেগের মুহূর্ত তখন সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বাবার মামাতো ভাইয়েরা।

চাষি ভাইয়ের নাম ভুলে গেছি। উনি যখন জানলেন যে, এই ভিটে বাড়ি অবিক্রীত হয়ে আছে, তখন তিনি আস্বস্ত হলেন। সম্ভবত ওনাকে কেউ উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছিলেন। আর আমি যতদূর জানি, সেই ভিটে এখনও অবিক্রীত আছে।

বাবার কাছেই শোনা, ঠাকুরদাদের মা প্রতিদিন আধ মন চালের ভাত রাধাতেন অর্থাৎ ক্ষেত মজুর, ব্যবসার কর্মচারী, পরিবারের সদস্য, মাঝি আর সব মিলে একটা গমগমে ব্যপার!

আমাকে অনেকেই একটা প্রশ্ন করেন যে, আচ্ছা বাংলাদেশের লোকজনের শুনেছি এত এত জমিজমা, যদি সব মিলে যোগ করি তাহলে তো দেখা যাবে যে, গোটা পৃথিবীটাই তোমাদের। আসলে ব্যপারটা খুব সোজা। এই যে আমি এখন গল্পটা বলছি, তেমনই আমাদেরই অন্য কোন শরিক এই ঘটনাটাই তো বলবেন! সবাই কিন্তু একটা বাড়ির কথাই বলছেন বিভিন্ন জন বিভিন্ন মানুষের কাছে!

আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা দেশ বিভাগের বলি আর তোমাদের সৌভাগ্য তোমাদের সব কিছু অক্ষত! সব যৌথ পরিবার গুলো ভেঙ্গে টুকরো হল দেশ বিভাগের মত। কিছু লোক সর্বশান্ত হল আর কিছু লোক পরিত্যক্ত সম্পতি পেয়ে রাজার হালে রইল। একটা মস্ত বড় গাছকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেললে সে কি আর বাঁচে? এঁদো গলিতে মাথা তুলে বাঁচার লড়াই করতে করতেই জীবনী শক্তি শেষ হয়ে যায়!

যেকথা বলছিলাম, এই ভান্ডারিয়াতে যেতাম বছরে একবার আমাদের গ্রীষ্মের ছুটির সময়। দাদুর মিষ্টির দোকানের ব্যবসা আর সঙ্গে থাকতেন ছোট কাকু। বাবা ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। দাদু আর কাকু মাসে একবার ঢাকায় আসতেন ব্যবসার প্রয়োজনে। ঠাকুরমা, ছোট কাকিমা আর ভাইবোনেরাও আসতো। আমাদের সেই কোয়াটারে তখন শুধুই আনন্দ! মায়ের অবশ্য খুব খাটুনি পড়ত, সেটা তখন বুঝতাম না।

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের বন্ধুরাও খুব খুশী তখন। ওদের মামা বাড়ির মানুষ এলে বা দাদা বাড়ির মানুষ এলে আমাদেরও খুব আনন্দ হতো। দুটি পরিবারের মধ্যে এক হৃদয়ের বন্ধন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সবার মাঝে সবার জন্য অকৃত্তিম ভালোবাসা ছিল বলেই আজও তাঁদের কথা মনে রয়ে গেছে।

ভান্ডারিয়া যেতে গেলে সেই সময় বড় লঞ্চে চেপে যেতে হতো। সদর ঘাট থেকে লঞ্চ বিকেল চারটের সময় ছাড়ত আর পরের দিন সকাল আটটা নাগাদ পৌঁছাত। সেই লঞ্চ আরও দক্ষিনে, বাগেরহাট অবধি যেত।

লঞ্চ যাত্রাটাও বেশ মজার। তখন একটা কি দুটো কেবিন থাকতো সেই লঞ্চে। বেশীর ভাগ সময়েই ফাঁকা পাওয়া যেত না। তাই, লঞ্চের ডেকই ভরসা। শতরঞ্চি পেতে তাতে তোষক পেতে জায়গা রাখা হতো। বড় ডেকচিতে ভাত রান্না করে নিয়ে যাওয়া আর সঙ্গে টিফিন ক্যারিয়ারে ডিমের ঝোল। কত লট বহর নিয়ে তবেই না যাত্রা! রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ঢেউয়ের দুলুনিতে দুলতে দুলতে একঘুমে রাত কাবার। ভোর বেলার আলোতে ঘুম ভাঙত।

অবশ্যি মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গেও যেত যখন চাঁদ পুর থেকে শিকার পুরের দিকে লঞ্চ পারি দিত। মাঝখানে পদ্মা আর মেঘনা নদী এক সাথে বয়ে চলেছে। আঠারো মাইল চওড়া সেই জলপথ খুব সাবধানে পাড়ি দিত সারেং ভাই। আর লঞ্চ গুলোতে তিনটে ইঞ্জিন রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। দুটো ইঞ্জিন চালিয়ে সেই বিশাল উত্তাল জলরাশি পাড়ি দেওয়া। একটা ইঞ্জিন কাজ না করলে তৃতীয় ইঞ্জিন চালু করা! দক্ষ না হলে লঞ্চ ডুবি অবধারিত।

একবার, "নাবিক" আর "পূবালী" নামক দুটি লঞ্চ পাড়ি দেবার সময় অনবরত ধাক্কা লাগার পরিস্থিতিতে পড়েছিলো অসম্ভব স্রোত এবং নদী উত্তাল হবার কারনে। আমরা, নাবিকের যাত্রী ছিলাম সেই সময়। খুব উদ্বিগ্ন হয়ে সবাই ঈশ্বরের নাম করছিলেন সেই সময়! সে এক অভিজ্ঞতা। কিন্ত এমনি স্বাভাবিক সময়ে অপেক্ষা করতাম কখন লঞ্চ কচা নামক নদীতে পড়বে। সেই নদীর পারেই তো ভান্ডারিয়া।

এখন তো পদ্মা নদী, মেঘনা নদীতে সেতু তৈরি হয়ে গেছে আর সম্ভবত বাসে বাসেই ঢাকা থেকে ভান্ডারিয়া চলে যাওয়া যায়।

 

বিঃদ্রঃ সঙ্গের ছবিটি বাবার সেলফ এক্সপজারে তোলা এবং বাবার নিজস্ব তৈরি করা ডার্ক রুমে এনলার্জ করা। এনলার্জটাও বাবার নিজস্ব ভাবনায় নিজের হাতে তৈরি। ছবিটি ঢাকার রমনা পার্কে তোলা।

 

(ক্রমশ)

আমার শৈশব (ধারাবাহিক) পর্ব ১ রামকৃষ্ণ মিশন রোড

 


আমার শৈশব

(ধারাবাহিক)

পর্ব ১

রামকৃষ্ণ মিশন রোড

 

আমাদের ছোটবেলা এত মজার ছিল যে কি বলব। ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশন রোড এ বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এ স্টাফ কোয়াটার এ তখন মাত্র দুটো বিল্ডিং। মাত্র চব্বিশ টা পরিবার। সবাই মিলে মিশে থাকা।

স্কুল ও খুব কাছে। হেঁটে যেতাম দল বেঁধে। সেকথা পরে হবে।

প্রকাণ্ড বড় খেলার মাঠ ছিল। এখন জানিনা পুরো মাঠ টা আছে কি না! না কি কংক্রিট খেয়ে নিয়েছে!

কোনও খেলা বাদ যেত না। বিকেল চারটা বাজলে এক মুহূর্ত ও ঘরে থাকার কোন কথা নেই... সোজা মাঠে! আমাদের বড় দিদি ছিলেন বেবি আপা। রুটিন বানিয়ে রেখেছিলেন খেলার - পুরো এক মাসের - যা তে কোনও খেলা বাদ না পরে!

কি কি ছিলনা তাতে! পুতুল খেলা, রান্না-বাটি, ফুটবল, ক্রিকেট, কবাডি, বেস বল, গোল্লা ছুট, বুড়ি বাসন্তী, আইস-বাইস, সাত চারা, এক্কা- দোক্কা, ছু-কিতকিত আরও কত কি।

হটাত মনে হল বনভোজন করব। মাঠের মাঝে এক বড় তাল গাছ। সবাই বাড়ি থেকে চাল আর আলু আর বোধ হয় দু পয়সা চেয়ে নিতাম মায়েদের কাছ থেকে। বড় দাদা আর দিদিরা মিলে ইট দিয়ে উনুন পেতে রান্না চাপাত। আমরা শুকনো ডাল আর পাতা কুড়িয়ে আনতাম। রান্না হয়ে গেলে সব এক সাথে বসে ওই তাল গাছের নিচে বসে খাওয়া।

তাল গাছ টা ছিল মাঠে একদম মাঝখানে। গাছটার এক পাশে একটা মড়া নদীর খাদ ছিল। বর্ষার জল জমে আমাদের চান করার মত জল ভরে উঠত তাতে। স্কুল থেকে ফিরে এক দৌড়ে সেই জলায় নেমে হুটোপুটি সেরে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে মার! রোজ মার খাওয়া আর রোজ জলায় চান।

একদিন আমি আর ভাই গামছা নিয়ে ছোট ছোট মাছ ধরে মায়ের কাছে মহা উৎসাহে নিয়ে এলাম! মা দেখে তো হেসেই আকুল! আসলে সে গুলো ছিল ব্যাঙ্গাচি!

এই যে সবাই এক সাথে থাকা। এই যে এত ভালবাসা! এই টান! কোথায় যে হারিয়ে গেলো।

 

ছবি পরিচিতিঃ ছবিটি বাবার তোলা আর বাবার নিজের তৈরী করা ডার্ক রুম ও enlarager এ ডেভেলপ করা। এই নিয়েও লিখবো।

(ক্রমশ)