আমার শৈশব
(ধারাবাহিক)
পর্ব ৩
নৌকা ভ্রমণ
আগের লিঙ্কঃ
Blog:
https://aakashgang.blogspot.com/2022/09/blog-post_20.html
Facebook:
https://www.facebook.com/photo/?fbid=5417813418297127&set=a.152509728160882
আগের পর্বে লিখেছি যে, আমার ঠাকুরদারা
ছিলেন ছয় ভাই। সেই অনেক কালের কথা। আগে একান্নবর্তী পরিবারভুক্ত ছিলেন পরে জীবিকার
প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু প্রানের টান তাতে একটুও কমেনি। বারো
মাসে তেরো পার্বণে দেখা সাক্ষাৎ হত মানে আমাদের এখনকার গেট টুগেদার পার্টি আর কি!
তবে এখনকার মত তো আর থাকা খাওয়ার অত সমস্যা ছিল না তাই সেই উপলক্ষে দিন কতক
বেড়ানোও হয়ে যেত।
নদীমাতৃক
দেশ। যানবাহনের বেশীর ভাগই ছিল জলযান। খালে বিলে ঘুরে বেড়াতে তালের ডিঙার জুড়ি
মেলা ভার। ছোটদের খুব প্রিয় – তবে বেয়ে যেতে বেশ দক্ষতার প্রয়োজন হত। অগভীর জলে চলত আর
সবাই সাঁতার জানতো বলে খুব একটা ভয়ের কিছু ছিল না। বর্ষাকালে মাঠে ঘাটে জল জমে
গেলে এই ডিঙাই ছিল মুশকিল আসান।
আর
এমনি ছোট ছোট নৌকা প্রায় সবার ঘাটেই বাঁধা থাকতো। তালের ডিঙা যদি হয় ডাঙার সাইকেল
তবে ছোট নৌকাগুলো হল মোটর সাইকেল। বড় নদীতে এইসব নৌকা নিয়ে চলাচল করা যেত না।
সেখানে দরকার হত আরও বড় নৌকা – পানসী বা বজরা এই সব ধরনের নৌকা।
আমরা
থাকতাম শহরে। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে কিছুটা পথ নৌকা করে যেতেই হত। বেশ ছোট
তখন আমি। ভান্ডারিয়ার দাদুর বাড়ি থেকে অন্য ফরিদপুরের ফাঁসিয়াতলায় তিন দাদুর বাড়ি
বেড়াতে যাওয়া ঠিক হল কয়েক দিনের জন্য। আমার ছোট ঠাকুরদার ছিল একটা মস্ত গয়নার
নৌকা। মা ও ছোট ঠাকুরদার কাছে শুধু শুনেছিলাম যে গয়নার নৌকাতে আমরা পাঁচ দিন ধরে
চলে সেই তিন ঠাকুরদাদের বাড়ি পৌঁছাবো।
অল্প
অল্প মনে পড়ছে – সেই নৌকা এত বড় ছিল যে তাতে একশ মণ ধান চাপানো যেত। যাহোক, মায়ের সাথে
আমরা দু’ভাই বোন, এক পিসী, ছোট ঠাকুমা আর দাদু সহ আমরা চাপলাম। মাঝে মাঝে মাঝি
মাল্লারা বিশ্রাম নিতে নোঙ্গর ফেলত। আর এই নৌকার সাথে একটা ছোট নৌকা মোটা কাছি
দিয়ে বাঁধা থাকতো – সেটাতে রান্না হত আর কোনও বন্দরের পাশ দিয়ে গেলে সওদা আনার
কাজে তা লাগত। গয়নার নৌকার একটা অংশের সাথে মই লাগানো থাকতো সেই ছোট নৌকাতে নামার
জন্য। আসলে ছোট বলছি -কিন্তু সেখানে রান্না-বান্না ছাড়াও বদলি মাল্লারা জিরিয়ে
নিতেন নইলে টানা পাঁচদিন নৌকা বাওয়া তো সম্ভব নয়।
তখন তো
সব কিছুই এলাহি ব্যপার স্যাপার। রান্নার বাসন পত্র ধোয়ার কাজে সেই ছোট নৌকাই ভরসা।
মনে পড়ে, আমরা স্নান ও করেছি সেখানে –
বালতি ভরে নদী থেকে জল তুলে। মায়েদের
স্নান করার সময় ওনারা কেউ নৌকাতে থাকতেন না।
সারাদিন
নৌকা চলত। সন্ধ্যার আগেই কোনও একটা লোকালয়ের কাছে এসে নোঙ্গর পড়ত। বাজার করে
রান্নার আয়োজন। কি কি রান্না হত কিছুই মনে নেই এখন আর। লণ্ঠনের আলোয় ঢুলু ঢুলু
চোখে খেয়ে দেয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়তাম আর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙতেই দেখতাম যে নৌকা চলছে।
নৌকার ছই এত বড় ছিল যে অনায়সে আমাদের এতগুলো লোকের জায়গা হয়ে যেত।
আমার
মনে নেই দু দিন চলার পর তিনদিনের মাথায় একটা বড় নদী পাড়ি দিল আমাদের গয়না। দাড়ে
গিয়ে বসলেন যিনি তাঁর মুখে প্রথম বদর বদর শুনলাম। মাকে জিজ্ঞাসা করতেই ঠাকুমা
বললেন যে পীর উনি। মানে নদীর দেবতা – ওনার নামে পাড়ি দিলে কোনও ভয় থাকে না। সারাদিন নৌকা পাড়িই
দিল – পথ আর শেষ হয়না! বড় হয়ে জেনেছিলাম যে সেই নদী আসলে পদ্মা নদী। পাড়ি
দেয়ার সময় ছোট নৌকায় সেদিন আর কোনও রান্না হয়নি। চিড়ে মুড়ি খেয়ে দুপুরবেলা কেটে
গিয়েছিল। সেদিন আর নৌকা চলেনি। সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিলেন দাদু সবাইকে আর আমাদের নিয়ে
ডাঙায় নামলেন। বাজার ঘুরে দাদুর সাথে কেনাকাটা করলাম। নৌকাতে ফিরে এসে দেখি অন্য
একটা নৌকা গয়নার সাথে বাঁধা। ওপরে উঠে দেখি –
তাঁতের শাড়ি, গামছা আর
লুঙ্গি বিক্রি করতে এসেছে। ঠাকুমা আমায় একটা ছোট্ট শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন আর সেই
শাড়ি পড়ে বন্ধুদের দেখিয়ে খুব মজা পেয়েছিলাম।
চতুর্থ
দিনে দেখলাম গুন টানতে। মাল্লার নৌকার সাথে কাছি বেঁধে নদীর পাড় বরাবর হেঁটে
নৌকাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যপার – স্রোতের
বিপরীতে হাঁটা যে!
আসলে
এখন তো আমরা নিমেষে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করে বেড়াতে পারি – কিন্তু আমি
বলছি কয়েক দশক আগের কথা! তখন দুরত্ব অতিক্রম করাটা কষ্টসাধ্য থাকলেও পথে নিরাপত্তা
ছিল। আর এখন নিজের বাড়িতেও আমরা কেউ নিরাপদ নই। সেদিন আর নৌকা চলল না। বিশ্রাম।
পরেরদিন আরও একবেলা নৌকা ভ্রমণ করে আমরা ফাঁসিয়াতলার বাড়িতে পৌঁছালাম। কিন্তু, সেই পাঁচদিনের
গয়নার নৌকার স্মৃতি এখনও আমার সুখস্মৃতির অন্যতম হয়ে আছে।
ছবি পরিচিতিঃ সঙ্গের ছবি দুটি বাবার
তোলা এবং বাবার নিজস্ব
তৈরি করা ডার্ক রুমে
এনলার্জ করা। এনলার্জটাও বাবার
নিজস্ব ভাবনায় নিজের হাতে তৈরি। ছবিটি
রামকৃষ্ণ মিশন রোডের কোয়াটারের
ব্যালকনীতে তোলা। পরনে দেশ থেকে
পাঠানো শাড়ি। ফটোর এ্যালবাম গুলোও
বাবার হাতে তৈরি। ছবির
পাশে সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখে রাখতেন। সেখানে
আমার ছোট বেলার ছবির
গায়ে লেখা রয়েছে যে
তখন আমার বয়স ১
বছর ৭ মাস। দ্বিতীয়
ছবিটি একটি বজরা র
ছবি। বুড়ি গঙ্গা নদীতে।
বাবার হাতের লেখা দেখা যাচ্ছে।
(ক্রমশ)
স্বাতী - ৩১ শে জুলাই ২০১৫




