আমার শৈশব
(ধারাবাহিক)
পর্ব ২
বিক্রমপুরের
কথা
আগের লিঙ্কঃ https://aakashgang.blogspot.com/2022/09/blog-post.html
বছরে আমরা
তিনবার অন্তত আত্মীয় স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। তার মধ্যে নিজেদের দেশের বাড়ি,
মামা বাড়ি অন্যতম। তার বাইরে যেতাম, কাথুরা নামে আরেক যায়গায়।
আমার বাবা খুব
ছোট বয়েসে পিতৃ-মাতৃহীন হয়েছিলেন। আমার ছিলেন ছয় ঠাকুরদা আর বাবারা তিন ভাই ও তিন
বোন। আদি বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বেজগাঁ গ্রামে। নিজের ঠাকুরদা ও
ঠাকুরমার অবর্তমানে বাবা ও ছোট কাকুকে প্রতিপালন করেন আমার ছোট ঠাকুরদা। মেজ কাকা
ও ছোট পিসিমা রইলেন তাঁদের মামা বাড়ি দিঘলীতে। বাকি দুই পিসিমা প্রতিপালিত হলেন
অন্য ঠাকুরদার কাছে।
বেজগাঁতে ছয়
ঠাকুরদাদের প্রধান জীবিকা ছিল চাষ এবং দুগ্ধজাত সামগ্রীর ব্যবসা। পদ্মার ভাঙনে বহু
চাষের জমি পদ্মা গর্ভে বিলীন হবার ফলে ঠাকুরদারা বিভিন্ন অঞ্চলে জীবিকার সন্ধানে
ছড়িয়ে গেলেন। ছোট ঠাকুরদা গেলেন বরিশাল জেলার দক্ষিনে ভান্ডারিয়াতে। বড় ঠাকুরদা সহ
আরও দুজন গেলেন ফরিদপুর , আরেকজন বরিশালের ভাটিখানায় আর অন্যজন আসামে।
আমার মাধ্যমিক
পরীক্ষা শেষে বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন সেই বেজগাঁতে আমাদের ভিটে বাড়িতে। বর্ষাকালের
জলের থেকে রক্ষা পেতে প্রায় বিঘে খানিক জমি ফুট আস্টেক মাটি দিয়ে উঁচু করে তারপর
ঘর তোলা হয়েছিল।
বাবা যখন এখান
থেকে চলে যান, তখন একটা আম গাছ পুঁতেছিলেন, সেই আম গাছটি তখন বিশাল বৃক্ষে পরিণত
হয়েছে। যেহেতু ভিটে বাড়ি বিক্রি করা হয়নি, সেহেতু ওখানে কেউ ছিলেন না। শুধু মাত্র
এক গরিব চাষি ভাই ছিলেন বংশ পরাম্পরায়। তিনিই গাছ থেকে আম পেড়ে বাবাকে দিলেন। খুব
আবেগের মুহূর্ত তখন সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বাবার মামাতো
ভাইয়েরা।
চাষি ভাইয়ের
নাম ভুলে গেছি। উনি যখন জানলেন যে, এই ভিটে বাড়ি অবিক্রীত হয়ে আছে, তখন তিনি আস্বস্ত
হলেন। সম্ভবত ওনাকে কেউ উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছিলেন। আর আমি যতদূর জানি, সেই ভিটে
এখনও অবিক্রীত আছে।
বাবার কাছেই
শোনা, ঠাকুরদাদের মা প্রতিদিন আধ মন চালের ভাত রাধাতেন অর্থাৎ ক্ষেত মজুর, ব্যবসার
কর্মচারী, পরিবারের সদস্য, মাঝি আর সব মিলে একটা গমগমে ব্যপার!
আমাকে অনেকেই
একটা প্রশ্ন করেন যে, আচ্ছা বাংলাদেশের লোকজনের শুনেছি এত এত জমিজমা, যদি সব মিলে
যোগ করি তাহলে তো দেখা যাবে যে, গোটা পৃথিবীটাই তোমাদের। আসলে ব্যপারটা খুব সোজা।
এই যে আমি এখন গল্পটা বলছি, তেমনই আমাদেরই অন্য কোন শরিক এই ঘটনাটাই তো বলবেন! সবাই
কিন্তু একটা বাড়ির কথাই বলছেন বিভিন্ন জন বিভিন্ন মানুষের কাছে!
আমাদের
দুর্ভাগ্য আমরা দেশ বিভাগের বলি আর তোমাদের সৌভাগ্য তোমাদের সব কিছু অক্ষত! সব যৌথ
পরিবার গুলো ভেঙ্গে টুকরো হল দেশ বিভাগের মত। কিছু লোক সর্বশান্ত হল আর কিছু লোক
পরিত্যক্ত সম্পতি পেয়ে রাজার হালে রইল। একটা মস্ত বড় গাছকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেললে
সে কি আর বাঁচে? এঁদো গলিতে মাথা তুলে বাঁচার লড়াই করতে করতেই জীবনী শক্তি শেষ হয়ে
যায়!
যেকথা
বলছিলাম, এই ভান্ডারিয়াতে যেতাম বছরে একবার আমাদের গ্রীষ্মের ছুটির সময়। দাদুর
মিষ্টির দোকানের ব্যবসা আর সঙ্গে থাকতেন ছোট কাকু। বাবা ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। দাদু
আর কাকু মাসে একবার ঢাকায় আসতেন ব্যবসার প্রয়োজনে। ঠাকুরমা, ছোট কাকিমা আর
ভাইবোনেরাও আসতো। আমাদের সেই কোয়াটারে তখন শুধুই আনন্দ! মায়ের অবশ্য খুব খাটুনি
পড়ত, সেটা তখন বুঝতাম না।
আমাদের পাশের
ফ্ল্যাটের বন্ধুরাও খুব খুশী তখন। ওদের মামা বাড়ির মানুষ এলে বা দাদা বাড়ির মানুষ
এলে আমাদেরও খুব আনন্দ হতো। দুটি পরিবারের মধ্যে এক হৃদয়ের বন্ধন তৈরি হয়ে
গিয়েছিল। সবার মাঝে সবার জন্য অকৃত্তিম ভালোবাসা ছিল বলেই আজও তাঁদের কথা মনে রয়ে
গেছে।
ভান্ডারিয়া
যেতে গেলে সেই সময় বড় লঞ্চে চেপে যেতে হতো। সদর ঘাট থেকে লঞ্চ বিকেল চারটের সময়
ছাড়ত আর পরের দিন সকাল আটটা নাগাদ পৌঁছাত। সেই লঞ্চ আরও দক্ষিনে, বাগেরহাট অবধি
যেত।
লঞ্চ
যাত্রাটাও বেশ মজার। তখন একটা কি দুটো কেবিন থাকতো সেই লঞ্চে। বেশীর ভাগ সময়েই
ফাঁকা পাওয়া যেত না। তাই, লঞ্চের ডেকই ভরসা। শতরঞ্চি পেতে তাতে তোষক পেতে জায়গা
রাখা হতো। বড় ডেকচিতে ভাত রান্না করে নিয়ে যাওয়া আর সঙ্গে টিফিন ক্যারিয়ারে ডিমের
ঝোল। কত লট বহর নিয়ে তবেই না যাত্রা! রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ঢেউয়ের দুলুনিতে
দুলতে দুলতে একঘুমে রাত কাবার। ভোর বেলার আলোতে ঘুম ভাঙত।
অবশ্যি মাঝে
মাঝে ঘুম ভেঙ্গেও যেত যখন চাঁদ পুর থেকে শিকার পুরের দিকে লঞ্চ পারি দিত। মাঝখানে
পদ্মা আর মেঘনা নদী এক সাথে বয়ে চলেছে। আঠারো মাইল চওড়া সেই জলপথ খুব সাবধানে পাড়ি
দিত সারেং ভাই। আর লঞ্চ গুলোতে তিনটে ইঞ্জিন রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। দুটো ইঞ্জিন
চালিয়ে সেই বিশাল উত্তাল জলরাশি পাড়ি দেওয়া। একটা ইঞ্জিন কাজ না করলে তৃতীয় ইঞ্জিন
চালু করা! দক্ষ না হলে লঞ্চ ডুবি অবধারিত।
একবার,
"নাবিক" আর "পূবালী" নামক দুটি লঞ্চ পাড়ি দেবার সময় অনবরত
ধাক্কা লাগার পরিস্থিতিতে পড়েছিলো অসম্ভব স্রোত এবং নদী উত্তাল হবার কারনে। আমরা,
নাবিকের যাত্রী ছিলাম সেই সময়। খুব উদ্বিগ্ন হয়ে সবাই ঈশ্বরের নাম করছিলেন সেই
সময়! সে এক অভিজ্ঞতা। কিন্ত এমনি স্বাভাবিক সময়ে অপেক্ষা করতাম কখন লঞ্চ কচা নামক
নদীতে পড়বে। সেই নদীর পারেই তো ভান্ডারিয়া।
এখন তো পদ্মা
নদী, মেঘনা নদীতে সেতু তৈরি হয়ে গেছে আর সম্ভবত বাসে বাসেই ঢাকা থেকে ভান্ডারিয়া
চলে যাওয়া যায়।
বিঃদ্রঃ
সঙ্গের ছবিটি বাবার সেলফ এক্সপজারে তোলা এবং বাবার নিজস্ব তৈরি করা ডার্ক রুমে
এনলার্জ করা। এনলার্জটাও বাবার নিজস্ব ভাবনায় নিজের হাতে তৈরি। ছবিটি ঢাকার রমনা
পার্কে তোলা।
(ক্রমশ)


No comments:
Post a Comment