Thursday, 27 October 2016

অনুভব - ২ : স্বাতী বিশ্বাস


অনেকেই বলেন কেন আমি পুরনো দিনের কথা এত মনে করি! আরে যতদিন বেঁচে আছি অতীত আর  বর্তমান নিয়েই তো বাঁচা! অতীত পেড়িয়েই তো বর্তমানে দাঁড়িয়ে থাকা। ভবিষ্যতে কি হবে আমরা কেউ কি তা বলতে পারি! না কি ভবিষ্যতের ওপর আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ আছে!

এই যে রোজ সকালে নাকে মুখে গুঁজে যে যার কর্মক্ষেত্রে বেড়িয়ে পড়ছি তারা কি কেউ নিশ্চিত হতে পারি কি - যে বাড়িতে ফিরবোই? তবে হ্যাঁ, একটা শৃঙ্খলার মধ্যে জীবন যাপন করলে সবারই সুবিধা কাজ কর্ম করতে। সেই কারনেই কিছু কিছু নিয়ম কানুন ধর্ম এসবের উৎপত্তি। ধর্ম মানুষকে সুশৃঙ্খল হতে সাহায্য করে। সব ধর্মই মানবিকতার পক্ষে – গোঁড়ামির নয়। মানুষ মানুষের জন্য সহানুভূতিশীল  থাকবে... বিপদে পাশে দাঁড়াবে – এটাই তো কাম্য । সবাই আমরা সেটা বুঝি অথচ মাঝে মাঝে মাথার পোকাগুলো কিলবিল করে অশুভ বুদ্ধিগুলির সাথে আঁতাত করে। তার থেকেই যত গণ্ডগোল আর বিপত্তি!

ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ... বন্ধুকে ছুরি মারা... বৃদ্ধ বাবা-মাকে গলগ্রহ ভাবা অথবা পরিত্যক্ত করা... রাজনীতি ... চাণক্য নীতি ... কত কিছুর আবির্ভাব ঘটে। সবাই ই বুঝি যে একদিন সব ছেড়ে চলে যেতে হবে তবুও ভোগের আকাঙ্ক্ষা কমে না। মুখে বলি ‘ভাল থাকো’ আর মনে মনে বলি ‘আমার চেয়ে বেশী ভাল থেকো না’! সেই যে একটা প্রচলিত বানী আছে না ‘ পরের ছেলে পরমানন্দ/ যত ভোগে যায় তত আনন্দ’!

আসলে আমরা কেউই সৎ  নই! বিপদে না পড়লে নিজের ব্যবহারে লাগাম টানি না! যতক্ষণ পারি গা বাঁচিয়ে চলি। নিজের ঘরে আগুন না লাগলে চেঁচাই না! সমাজের দায় নিতে চাই না। না হলে একাবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কুসংস্কারকেই প্রশ্রয় দিই! বাচ্চাদের স্বার্থপর হতে শেখাই স্বার্থ ত্যাগ করা তো বোকামির নামান্তর। আমি, সে আর আমাদের একমাত্র সন্তান এই নিয়ে পরিবার। বাবা মা বাইরে সন্তান হয় ক্রেসে নয় আয়া বা দিদিমার কাছে [ঠাকুমা নয়!]। কি শেখাচ্ছি আমরা সমাজকে? দায় তো আমাদের নিতেই হবে!

একবার লোকাল ট্রেনে যাতায়ত করার সময় দুই বন্ধুর কথোপকথন কানে এসেছিল। প্রথমজন দ্বিতীয় জনকে তার মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলো। দ্বিতীয়জন দু এক কথার পর যা বলেছিল তা এখনও আমার কানে বাজে। সে বলেছিল ‘ মা কে তো বউ এসে তাড়াবে’! জানিনা তার মা কেমন ছিলেন ছেলের বিয়ের পর!

বৃন্দাবনে, কাশীতে কত পরিত্যক্ত মায়েরা ধুঁকছেন। আমরা কি পারিনা একটু সচেতন হতে? বুড়ো বাবা মা তো আমাদের কত কষ্ট করে লালন করেছেন... আমরাও করছি আমাদের সন্তানদের। তবে কেন এত অবহেলা। আরেকটা ঘটনা ব্যক্ত করি। সল্টলেক-উল্টোডাঙ্গার  কাছে হাডকোর মোড়ে এক বৃদ্ধ লোককে কুণ্ঠা ভরে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম ভিক্ষা করার জন্য। বাস থেকে দেখতাম। মুখে কিছুই বলতেন না বা কাউকে বিরক্ত করতেন না। বোঝাই যায় পেটের দায়ে পথে বেরিয়েছেন। পরে জেনেছিলাম, সল্টলেকেই ওনার বাড়ি। ছেলেরা দেখেনা তাই ভিক্ষা। কিছুই কি করা যায় এনাদের জন্য?

সবাই তো সুস্থ হয়ে জন্মায় না। কেউ কেউ আংশিক  পঙ্গু , বিকলাঙ্গ বা মানসিক ভাবে অসুস্থ। সমাজ যেন এদের ব্রাত্য করার জন্যই মুখিয়ে থাকে। তাঁদের বাবা মায়েদের কষ্ট কি আমরা কেউ অনুভব করি? আমাদের সবারই এমন পরিবারের সাথে পরিচয় ঘটেছে! তারা সব সময় ভয়ে কাঁটা  হয়ে থাকেন যে তাঁদের অবর্তমানে সেই সন্তানের পরিণতির কথা ভেবে।

০৬.০৫.১৪

মঙ্গলবার, কোলকাতা
স্বাতী বিশ্বাস

অনুভব - ১ : স্বাতী বিশ্বাস



জীবনের প্রায় অর্ধেকটা পথ পার হয়ে এসেছি। নানা চড়াই আর উৎরাই পথটাতে। সব সাধ পূর্ণ হয়না আবার কিছু কিছু জিনিষ না চাইতেই এক ঝলক শীতল হাওয়ার মত এসে পথের ক্লান্তি দূর করে দেয়। বাঙালী তো – তায় আবার পূর্ব বাঙলার  মুক্তিযুদ্ধ দেখা  রক্ত বইছে দেহে... আবেগটা একটু বেশী। এই আবেগের জন্য খেসারত ও কম দেইনি! কি করব! সবাই তো আর এক রকম হয়না!

ফেলে আসা দিনগুলো মাঝে মাঝেই উঁকি মারে আজকাল। বিশেষ করে শৈশবের মুহূর্তগুলো। ওপার বাংলায় কেটেছে শৈশব আর কৈশরের বেশীর ভাগ  সময়। তখন তো যোগাযোগ ব্যবস্থা এত ভাল ছিলনা। টেলিফোন কদাচিৎ কারো কারো বাড়িতে থাকতো। তাই  বন্ধুদের সাথে আড্ডামারার একমাত্র সময় ছিল টিফিন টাইম আর  পিরিয়ড পালটাবার মাঝে ক্লাসে টিচার আসার আগের সময়টুকু!  পড়া তো ক্লাসে এত সুন্দর ভাবে শিক্ষকেরা বুঝিয়ে দিতেন যে বাড়িতে গিয়ে দু একবার সেই পড়া পড়লেই মনে থেকে যেত। তাই পরীক্ষার সময় অত চাপ ও ছিলনা।

কোচিং ক্লাসের জন্ম তখনও আমাদের কাছে অজানা। মনে পড়ছে , ক্লাস টেনে থাকাকালীন আমাদের এক সহপাঠিনীকে পদার্থবিদ্যার  মনোয়ার আলি স্যর  খুব উদ্বিগ্ন হয়ে  ডেকে বলেছিলেন “বলতো মা! আমার পড়া কি তুমি বুঝতে পারছ না? তা হলে বাড়িতে অন্য শিক্ষকের কাছে পড়তে হচ্ছে কেন?” ! এই দায়বদ্ধতার শিক্ষা এখনও ভুলতে পারিনি।
কোহিনূর আপা কেমিস্ট্রি পড়াতেন কি সুন্দর করে। ডাক্তার স্যর জীবনবিজ্ঞান, পণ্ডিত স্যর বাংলা, নাজমা আপা ইংরেজি ... সবাই কি সুন্দর পড়াতেন। এত বছর পরেও তাঁদের চোখ বুজলেই স্পষ্ট দেখতে পাই।
আজকাল... এই বিশাল যোগাযোগ ব্যবস্থার দৌলতে পৃথিবী হাতের মুঠোয়! আমাদের নতুন প্রজন্ম কর্ম জগতে এক এক করে প্রবেশ করছে... ভয় হয় ঠিকঠাক থাকবে তো সব! এত ইঁদুর দৌড় আর এত মুখোশের ছড়াছড়ি চারিদিকে ... দায়বদ্ধতার কোনও মূল্যই থাকে না শেষে!
তবুও ফল্গুধারার মত একটা  চোরাস্রোত বয়ে যায় অবিরাম ... সবাই ভাল থাকুক... চেতনায় থাকুক। অনিষ্ট না হয় কারো! ঈশ্বর মঙ্গলময়... তিনিই সব ঠিক করে দেবেন।


স্বাতী বিশ্বাস
০৫।০৫।২০১৪
সোমবার, কোলকাতা।


Monday, 24 October 2016

দ্বিখণ্ডিত : স্বাতী বিশ্বাস


১) কবিতা ক্লাবে - "choice of  the  day " শিরোপা পেয়েছিল 
২) অন্য নিষাদ - ব্লগজিনে প্রকাশিত হয়েছে 




Sunday, 23 October 2016

নৌকা : স্বাতী বিশ্বাস


স্বাতী বিশ্বাস

আমার ঠাকুরদারা ছিলেন ছয় ভাই। সেই অনেক কালের কথা। আগে একান্নবর্তী পরিবারভুক্ত ছিলেন পরে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু প্রানের টান তাতে একটুও কমেনি। বারমাসে তেরো পার্বণে দেখা সাক্ষাৎ হত মানে আমাদের এখনকার গেট টুগেদার পার্টি আর কি! তবে এখনকার মত তো আর থাকা খাওয়ার অত সমস্যা ছিল না তাই সেই উপলক্ষে দিন কতক বেড়ানোও হয়ে যেত।

নদীমাতৃক দেশ। যানবাহনের বেশীর ভাগই ছিল জলযান। খালে বিলে ঘুরে বেড়াতে তালের ডিঙার জুড়ি মেলা ভার। ছোটদের খুব প্রিয় তবে বেয়ে যেতে বেশ দক্ষতার প্রয়োজন হত। অগভীর জলে চলত আর সবাই সাঁতার জানতো বলে খুব একটা ভয়ের কিছু ছিল না। বর্ষাকালে মাঠে ঘাটে জল জমে গেলে এই ডিঙাই ছিল মুশকিল আসান।

আর এমনি ছোট ছোট নৌকা প্রায় সবার ঘাটেই বাঁধা থাকতো। তালের ডিঙা যদি হয় ডাঙার সাইকেল তবে ছোট নৌকাগুলো হল মোটর সাইকেল। বড় নদীতে এইসব নৌকা নিয়ে চলাচল করা যেত না। সেখানে দরকার হত আরও বড় নৌকা পানসী বা বজরা এই সব ধরনের নৌকা।

আমরা থাকতাম শহরে। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে কিছুটা পথ নৌকা করে যেতেই হত। বেশ ছোট তখন আমি। এক দাদুর বাড়ি থেকে অন্য দাদুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ঠিক হল কয়েক দিনের জন্য। আমার ছোট ঠাকুরদার ছিল একটা মস্ত গয়নার নৌকা। মা ও ছোট ঠাকুরদার কাছে শুধু শুনেছিলাম যে গয়নার নৌকাতে আমরা পাঁচ দিন চলে আরেক ঠাকুরদার বাড়ি পৌঁছাবো।

অল্প অল্প মনে পড়ছে সেই নৌকা এত বড় ছিল যে তাতে একশ মণ ধান চাপানো যেত। যাহোক, মায়ের সাথে আমরা দুভাই বোন, এক পিসী, আরেক ঠাকুমা আর দাদু সহ আমরা চাপলাম। মাঝে মাঝে মাঝি মাল্লারা বিশ্রাম নিতে নঙ্গর ফেলত। আর এই নৌকার সাথে একটা ছোট নৌকা মোটা কাছি দিয়ে বাঁধা থাকতো সেটাতে রান্না বাড়া হত আর কোনও বন্দরের পাশ দিয়ে গেলে সওদা আনার কাজে তা লাগত। গয়নার নৌকার একটা অংশের সাথে মই লাগানো থাকতো সেই ছোট নৌকাতে নামার জন্য। আসলে ছোট বলছি -কিন্তু সেখানে রান্না-বান্না ছাড়াও বদলি মাল্লারা জিরিয়ে নিতেন নইলে টানা পাঁচদিন নৌকা বাওয়া তো সম্ভব নয়।

তখন তো সব কিছুই এলাহি ব্যপার স্যাপার। রান্নার বাসন পত্র ধোয়ার কাজে সেই ছোট নৌকাই ভরসা। মনে পড়ে, আমরা স্নান ও করেছি সেখানে বালতি ভরে নদী থেকে জল তুলে। মায়েদের স্নান করার সময় ওনারা কেউ নৌকাতে থাকতেন না।

সারাদিন নৌকা চলত। সন্ধ্যার আগেই কোনও একটা লোকালয়ের কাছে এসে নোঙ্গর পড়ত। বাজার করে রান্নার আয়োজন। কি কি রান্না হত কিছুই মনে নেই এখন আর। লণ্ঠনের আলোয় ঢুলু ঢুলু চোখে খেয়ে দেয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়তাম আর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙতেই দেখতাম যে নৌকা চলছে। নৌকার ছই এত বড় ছিল যে অনায়সে আমাদের এতগুলো লোকের জায়গা হয়ে যেত।

আমার মনে নেই দু দিন চলার পর তিনদিনের মাথায় একটা বড় নদী পাড়ি দিল আমাদের গয়না। দাড়ে গিয়ে বসলেন যিনি তাঁর মুখে প্রথম বদর বদর শুনলাম। মাকে জিজ্ঞাসা করতেই ঠাকুমা বললেন যে পীর উনি। মানে নদীর দেবতা ওনার নামে পাড়ি দিলে কোনও ভয় থাকে না। সারাদিন নৌকা পাড়িই দিল পথ আর শেষ হয়না! বড় হয়ে জেনেছিলাম যে সেই নদী আসলে পদ্মা নদী। পাড়ি দেয়ার সময় ছোট নৌকায় সেদিন আর কোনও রান্না হয়নি। চিড়ে মুড়ি খেয়ে দুপুরবেলা কেটে গিয়েছিল। সেদিন আর নৌকা চলেনি। সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিলেন দাদু সবাইকে আর আমাদের নিয়ে ডাঙায় নামলেন। বাজার ঘুরে দাদুর সাথে কেনাকাটা করলাম। নৌকাতে ফিরে এসে দেখি অন্য একটা নৌকা গয়নার সাথে বাঁধা। ওপরে উঠে দেখি তাঁতের শাড়ি, গামছা আর লুঙ্গি বিক্রি করতে এসেছে। ঠাকুমা আমায় একটা ছোট্ট শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন আর সেই শাড়ি পড়ে বন্ধুদের দেখিয়ে খুব মজা পেয়েছিলাম।

চতুর্থ দিনে দেখলাম গুন টানতে। মাল্লার নৌকার সাথে কাছি বেঁধে নদীর পাড় বরাবর হেঁটে নৌকাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যপার স্রোতের বিপরীতে হাঁটা যে!
আসলে এখন তো আমরা নিমেষে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করে বেড়াতে পারি কিন্তু আমি বলছি কয়েক দশক আগের কথা! তখন দুরত্ব অতিক্রম করাটা কষ্টসাধ্য থাকলেও পথে নিরাপত্তা ছিল। আর এখন নিজের বাড়িতেও আমরা কেউ নিরাপদ নই। সেদিন আর নৌকা চলল না। বিশ্রাম। পরেরদিন আরও একবেলা নৌকা ভ্রমণ করে আমরা অন্য দাদুর বাড়িতে পৌঁছালাম। কিন্তু, সেই পাঁচদিনের গয়নার নৌকার স্মৃতি এখনও আমার সুখস্মৃতির অন্যতম হয়ে আছে।



৩১ শে জুলাই ২০১৫