আমার শৈশব
(ধারাবাহিক)
পর্ব ৪
রয়ানী পূজা
আগের লিঙ্কঃ
https://www.facebook.com/swati.star.sra/posts/5425785434166592
আগের পর্ব
গুলোতে লিখেছি আমার ঠাকুরদাদাদের বিক্রমপুরের ভিটে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করার
কথা। আগের পর্বে ভান্ডারিয়া থেকে ফাঁসিয়া তলায় পৌঁছানোর ঘটনা লিখেছি।
আমার নিজের
ঠাকুরদা সহ আরও দুই ঠাকুরদা এই ফাঁসিয়া তলাতে বসবাস শুরু করেন।আমার নিজের ঠাকুরদার
অকাল প্রয়াণের পর বাবারা বিভিন্ন পরিবারের প্রতিপালিত হয়েছিলেন। বাবার মুখে শোনা, সেই
সময় ফাঁসিয়াতলা খুব একটা জন বহুল ছিল না। বাড়িগুলো কাঠের পাটাতনের ওপর টিনের ছাউনি
রয়ানি পূজা দিয়ে তৈরি হতো।
এই জায়গায়
খুব একটা যাতায়ত ছিল না। মাঝে মধ্যে কোন বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিয়ে শাদীর পর্ব থাকলে যাওয়া
হত।
তেমনি একবার,
“রয়ানী পূজা” উপলক্ষে ঢাকা থেকে গিয়েছিলাম আমরা। সম্ভবত মনসা দেবীর একটি রূপ। ব্যবসার
প্রয়োজনে নদী পথকে ব্যবহার করা হত বলে হয়তো গঙ্গা দেবীর পূজার প্রচলন হয়েছিল বলে আমার
অনুমান। তেমনই আবার বর্ষা কালে মনসা দেবীকে তুষ্ট করতে এই পূজার প্রচলন। গুগুলে অবশ্য
, রয়ানী দেবীকে মনসা দেবীর আরেক রূপ বলেই বর্নণা
করা হয়েছে।
নেট ঘেঁটে
একটা পাঁচালি পেলাম, সেখানে মনসা দেবীকেই বোঝানো হয়েছে। সেটা এখানে দিলামঃ-
রয়ানীর ব্রত
পাঠ
চন্দ্রপত্নী
শিব পুরে মনসা পূজিছে
চন্দ্রধর বানিজ্য
সেরে ঘরে ফিরিয়াছে
দ্বারেতে দাঁড়ায়ে
চন্দ্র ডাকে বারংবার
দাস দাসী আসে
ডাক শুনিয়া তাহার
দাসদাসী সবে
মিলি সাধুরে কহিলে
মনসা পূজিছে
মাতা শিবের আলয়ে
এতক শুনি চান্দো
রাগে ক্রুদ্ধ হয়
ছুটিয়া গিয়া
তবে সনকারে কয়
মোর ঘরে মনসার
কেন পূজো হয়
তব কাছে দেখি
মোর খানিক মান নাই
মোরে না জিজ্ঞাসিয়া
এই কাজ করিলে
কোথা হতে মনসার
ঘট আনিলে
কহিল সনকা স্বামী
না করিও রাগ
দেবীর ইচ্ছে
এই ঘরে পূজা পাক
ভোর রেতে আমি
এক দেখেছি স্বপন
পুত্র বাঁচে
পতি বাঁচে পূজার ই কারন
ক্রুদ্ধ না হইয়া
এবে করো দেবী পূজা
না পূজিলে দেবী
দেবে সুকঠিন সাজা
হাঁসিয়া কহিল
চাঁদ সে কি করিবে
কানী হইয়া সে
বুঝি আমারে মারিবে
যেই গৃহে পূজি
আমি দেব কৈলাসপতি
সেই ঘরে বেদে
পূজো এই তোর মতি
এতক বলিয়া চাঁদ
করিল আঘাত
দেবীর ঘটের পরে
করে পদাঘাত
ভাঙিয়া ছড়ায়ে
যায় মনসার ঘট
লন্ডভন্ড করে
যত পূজার অর্ঘ্য সাজ
দেখিয়া পদ্মাবতী রেগে হয়
লাল
হায়রে চান্দো
তোর কি দূর্মতি বল
দেখ তবে এই বার
কি করিব আমি
এত অহংকার তোর
খাবে ভূমে চুমি
চান্দের স্পর্ধা
দেখি ক্ষুব্ধ হয় বিষহরী
নাগদল লয়ে আসে
চম্পক নগরী
চান্দের ফলের
বন ধ্বংসিবে আজ
ছুটে আসে যত
মালি দেখে উগ্র সাজ
বনের যত মালিগন
ঠেকিবারে আসে
নীল হয়ি ঢলে
পড়ে নাগেদের বিষে।।
কোথা ছিল চন্দ্রধর
আসিল তখন
নগরের শঙকুরে
ডাকো এই ক্ষন
শঙকু ওঝা আসিলরে
যথা সেই স্থানে
একে একে সবার
বিষ নামাইল তখনে
চান্দের মহাজ্ঞান
শিবের বরদান
জিয়াইল সব মালি
মন্ত্রের ই কল্যাণ
মনসা গরজিয়া
মরে কি করিবে এবে
যুক্তি করে নেতা
সনে বলো দিদি তবে
যুক্তি করি মনসা
যাই শঙ্কুর ঘরে
ছল করি শঙ্কুরে
তখনই মারে
পরে গেল চন্দ্রের
কাছে ধরে নটীবেশ
চান্দের মহাজ্ঞান
করিতে নিঃশেষ
নটীর রূপটি দেখিয়া
চাঁদ মুগ্ধ হয়
দেখিবারে নয়ন
দুখান ফিরি ফিরি চায়
গলায় দোলে ফুলের
মালা মাথে ফুলের সাজ
কাপড়ের আঁচল
দিয়া ঢাকে মুখের লাজ
কোমল দোদুল চলন
আসি চাঁদের বুকে বেঁধে
মুখখানা দেখিবার
লাগি বারে বারে সাধে
অপরূপ রূপ দেখি
জাগিল মদন
মোহিত হল চান্দো মায়ার ই
কারন
ছল করি মনসা
মন্ত্র জেনে নেয়
না বুঝিয়া চান্দো
মন্ত্র দিয়ে দেয়
তাহার পরে উঠি
নটী দেখায় আসল রূপ
দেখিয়া চান্দের
কাঁপিল যে বুক…
বাকি আর পেলাম না।
সে
যাই হোক। দেবীর ছবি বাবার ক্যামেরায় বন্দী হয়েছিল। সেই ছবি সঙ্গে রইল। আর তার সঙ্গে
এটাও মনে আছে যে, আমার জীবনের প্রথম যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে।
এই
প্রসঙ্গে বাবার বলা একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। আমার নিজের ঠাকুমা ঠাকুরদা তখনও বেঁচে।
বর্ষা কালের ঘটনা। বিক্রমপুরের বসত ভিটে মাটি দিয়ে উঁচু করা ছিল। তার ওপরে কাঠের পাটাতন
দেয়া মেঝে , অনেকটা মস্ত চৌকির ওপর যেন ঘর
গুলো বানানো । টিনের ছাদ। ছাদের ঠিক নীচে আবার একটা করে কাঠের পাটাতন, এখনকার লফটের
মতো। সেখানে যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস মজুদ করে রাখা হত। মেঝের পাটাতনের মাঝের ফাঁক দিয়ে
নীচের মাটি দেখা যেত। বর্ষা কালে বন্যার জল উঠলেও তাই ঘরে উঠত না। বাবারা সেই সময়, পাটাতনের মাঝে ছিপ
ফেলে ছোট ছোট মাঝ ধরতেন।
একদিন,
রাতে বাবারা যখন ঘুমিয়ে আছেন, হঠাত শীতল কিছুর স্পর্শে ঘুম ভেঙ্গে যায়। লন্ঠনের সলতে
রাতে খুব অল্প করে মৃদু আলো যাতে পাওয়া যায়
সেই ভাবে জ্বালিয়ে রাখা হতো। এই ব্যপারটা আমি গ্রামের বাড়িতে খেয়াল করেছি।
সে
যাই হোক, সেই হ্যারিকেনের মৃদু আলোতে যেটা ঠাকুমা বাবা কে বলেছিলেন যে, বর্ষাকালে সাপের
গর্তে জল ভরে যাবার জন্য, সাপটি বিছানায় চলে এসেছে। বাবারা যেন নড়াচড়া না করেন। প্রায়
নাকি আধ ঘন্টা পরে সাপটি কাউকে কিছু না করে নিজেই কোথাও চলে যায়।
ছোট
বেলা এই সব শুনতে শুনতে মুখ হাঁ আর চক্ষু ছানা বড়া হয়ে যেত। হয়তো, পরবর্তি কালে বাস্তু
সাপ নিয়ে কোন লেখা বা কাজী নজরুল ইসলামের “পদ্ম গোখরা” পড়তে গিয়ে একটা অন্য অনুভূতি
কাজ করেছে!
যত
লিখছি, ততই যেন, সিনেমার রিলের মত পুরানো ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বাবার মুখে
গল্প শুনতে শুনতে কল্পনায় যে দৃশ্য ভেসে উঠত, আজ এই বৃদ্ধ বয়সে অবিকল সেই ছবিটি দেখতে
পাচ্ছি। কি চমৎকার ভাবে বাবা ঘোটনাটি বলেছিলেন যা গভীর ভাবে ছাপ ফেলে গেছে মনে।
ছোট
দাদুও এমন অনেক মজার ঘটনা বলতেন। বাবা আর দাদু গল্প বলার ছলে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে
গিয়েছেন। লিখতে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলাম।
রয়ানী পূজা উপলক্ষে দাদুরা যাত্রার দলের বায়না করে রেখেছিলেন। অভিনেতারা
এবং কলাকুশলীরা একটা ঘরকে সাজ ঘর বানিয়েছিলেন সেটা মনে আছে। নারকেলের মালার ভেতর হরেক
রঙ! সেগুলো দিয়ে মেকআপ। পরচুলা, রাজার ঝলমলে পোশাক দেখতে দেখতে আমাদের মুখ একদম হা!
অপার বিস্ময়ে খেয়াল করলাম যে, একজন কাকু সাজতে সাজতে রানী হয়ে গেলেন! সব মেকআপ হয়ে
গেলে মস্ত উঠানের একপাশে চৌকি দিয়ে উঁচু করে মঞ্চে ওনারা অভিনয় করলেন হ্যাজাকের আলোতে।
চৌকির দুই পাশে যন্ত্র শিল্পীরা বসে। পাশ থেকে একজন পাঠ বলে দিচ্ছে সেটাও খেয়াল করে
একটা রহস্যের সমাধান পেয়ে খুব আনন্দ হল। কেননা, বারে বারেই তো ভাবছিলাম যে মুখস্থ করে
কি ভাবে পার্ট করে! যাক! বাবা! খুব শান্তি!
অবশ্য
বলে রাখা প্রয়োজন যে, রাতের খাওয়া দাওয়ার পাঠ চুকিয়েই এই আসর বসেছিল। উঠানে খড় বিছিয়ে
তার ওপর চট ফেলে দর্শক আসন। মহিলারা বাড়ির ভেতরের দাওয়ায়। শিল্পীরা উচ্চ স্বরে সংলাপ
বলছিলেন। অবশ্য কিছুই মনেও নেই বা বুঝতেও পারিনি। পালার নাম কি ছিল সেটাও মনে নেই।
বাবার সব মনে থাকতো। কিন্তু এখন তো বাবাও নেই।
যতটা
উৎসাহ ছিল সাজগোজ দেখার ততটা উৎসাহ আর ছিলোনা পালা দেখায়। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আর
কখনই বা মা বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলেন কিছুই আর মনে নেই। ফাঁসিয়া তলার স্মৃতি আমার এই
টুকুই।
ছবি পরিচিতিঃ সঙ্গের ছবি বাবার তোলা এবং বাবার নিজস্ব তৈরি
করা ডার্ক রুমে এনলার্জ করা। এনলার্জটাও বাবার নিজস্ব ভাবনায় নিজের হাতে তৈরি।
একটি ছবিতে রয়ানী দেবী মূর্তি।
(ক্রমশ)


