Wednesday, 20 December 2017

সূতো : স্বাতী বিশ্বাস

সূতো

অলৌকিক বা ভৌতিক
কিছুতেই  ব্যাখ্যা মেলেনা
অতলান্ত যেমন ফিরিয়ে দেয়
তেমনই এক হেমন্তের পাখি হয়ে
দেখা দিলে পড়ন্ত বেলায়।

কতটা পথশ্রমে ক্লান্ত আজ?
নাটকীয় না কি অন্যকিছু !
না কি সম্পূর্ণ কল্পনা।
সম্পূর্ণ রূপান্তরিত অজানা এক কায়া
দুর্বোধ্য রহস্যের উত্তরের ভারে বিপর্যস্ত।

একটা বিন্দুতে মিলে 
বৃত্ত গড়ার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে
হারিয়ে গেলে  সুদূর  নক্ষত্রপুঞ্জে-
জীবন চলার পথে থামা যায় না,
অন্য বৃত্ত ঘিরে ফেলে স্বর্ণলতার মত।

কক্ষপথ যে নিক্তি দিয়ে মাপা
দায়বদ্ধতার বন্ধনে   শৃঙ্খলিত।
অতীতে ফিরে যাবার  থিওরি জানিনা,
তা হলে সেই সময় সাহসী হয়ে বলতাম,
"ঘুড়ির সূতো টা আমিই কেটে দিলাম"!

-----------------------
স্বাতী বিশ্বাস
২ আগস্ট ২০১৩, শুক্রবার
কোলকাতা
--------------------

Tuesday, 19 December 2017

উৎকণ্ঠা ঃ স্বাতী বিশ্বাস

উৎকণ্ঠা

                                           ছবি সৌজন্য ঃ  অন্তরজাল
মাধুরীর বাড়িতে আর ভাল
লাগে না। মেয়েটা বাইরে – এই পোড়ার জায়গায় একটা কাজ জুটল না! কাজের জন্য  মাথা খারাপ হবার জোগাড়! কাজ ছাড়া   এই 
বয়সে কি করে? চুরি ডাকাতি নয় তো অসৎ পথ। কোনটাই তো হবে না! তাই ডিপ্রেশনে
ভুগে মাথা খারাপ হব হব। এমনি সময় ক্যাম্পসিং এর রেজাল্ট বেরুল। কাজ জুটল কিন্তু
বাইরে। না যেতে দেয়া ছাড়া আর গতি নেই।

সে না হয় হল! একা মেয়ে
বিদেশ বিভুয়ে থাকে কি করে! আরে অসুখ – বিসুখ আছে, একা বাড়িতে কথা  বলার দ্বিতীয় প্রাণীটি পর্যন্ত নেই! কাছে থাকলে
কুটো নাড়তে দেয়নি অথচ ওখানে সব কাজই নিজেকে করতে হয় বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার, কাপড়
কাচা, রান্না ... বাইরের খাবার আর কত খাওয়া যায়!

সব সামলে অফিস! ওইটুকু
মেয়ে – যাকে তুলোয় মুড়ে রাখা তাকে কত কি না করতে হচ্ছে। বাইরেরও কত কাজ! লাইটের
বিল, কেবলের বিল, বাজারহাট আর কত কি! মাধুরী চোখের জল ফেলে আর ঠাকুরকে ডাকে। কর্তা
কে বলে লাভ নেই – বলে “তোমার একটু বেশী বেশী”! সাথে সাথে অমুকের মেয়ে তমুকের ছেলের
উদাহরণ! ভাল্লাগেনা আর!

সারাদিন হা পিত্যেশ করে
বসে থাকে – কখন মেয়েটার সাথে একটু কথা বলবে! নতুন ছেলেমেয়েগুলোকে নিংড়ে নেয় অফিস।
তাই রাতেই যা কথা হয় দু চারটে! অত ক্লান্ত থাকে – তার ওপর ঘরের কাজ কর্মগুলোও
সারতে হয়! মাঝে মাঝে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখে মেয়ের – আস্বস্ত হয়!  হোয়াটসঅ্যাপসে দুএকটা মেসেজ – এই নিয়েই চলছে!
তবুও রাতে যতক্ষণ না মেয়ের সাথে কথা বলতে না পারে ততক্ষণ স্বস্তি পায়না!

এইতো সেদিন কিছুতেই ফোনে
যোগাযোগ করা গেলনা... কর্তা বললেন “অত ক্লান্ত হয়ে এসেছে - হয় চার্জ নেই নয় তো
ভুলে গেছে – এমন তো হতেই পারে – তোমার হয় না?”  ব্যস এক কথায় দু কথায় লেগে গেল কর্তা গিন্নীতে।
রাতের খাওয়া মাথায় উঠল! যত রাজ্যির আশঙ্কা মাথায় ঘুরতে লাগল! মুহূর্তগুলো যেন
একেকটা বছর মনে হতে লাগলো।   

“সব আমার কপালের দোষ”! কি
করবে কোথায় যাবে! ভাবতে ভাবতেই ফোন বাজে – ধরা গলায় মেয়ে বলে “আজ একটু তাড়াতাড়ি
বাড়ি ফিরেছি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন ভাত বসাবো”। ঘড়িতে তখন রাত
দুটো।

স্বাতী বিশ্বাস *
শুক্রবার, ১৯.১২.১৪ * কোলকাতা

Monday, 18 December 2017

নির্ভয়ারা একই আছে ঃ স্বাতী বিশ্বাস

নির্ভয়ারা একই আছে
-----------------------------
সব একই থাকে ...........
জীবনের বাইরে তো যাওয়া যায় না।
জীবন মানে তো প্রস্থানের দিকে হাঁটা
মাঝের সময়গুলো একেকটি স্টেশন।
এসেছি একা কিন্তু পাখি তো নই
সময়ের সাথে পারিপার্শ্বিকতার চক্রবুহ্যে
জড়িয়ে চলি অবিরাম সেই পথে
যে পথে আগে হেঁটে গেছে আমার পূর্ব মানবী।
যাঁরা আগে হেঁটেছিল সেই প্রাগ ঐতিহাসিক যুগ থেকে
ক্রমশ অতীত গহ্বর থেকে একেকটি অবয়ব প্রকট হয়ে
সমুখে এসে দাঁড়িয়ে গতিরোধ করে আমার
কোটি কন্ঠ থেকে নির্গত হয় একটিই প্রশ্ন
নারী লাঞ্ছনা কেন কমেনি এখনো?
আমি স্বপ্নাহতের মত ভাবতে থাকি
কি বলা উচিৎ বা অনুচিৎ হবে।
একে একে আমার চারিপাশে মানব বন্ধনী তৈরী হয়
স্পষ্ট দেখি দ্রৌপদী সীতা অহল্যা থেকে নির্ভয়াকে।
মাথার উপরে উড়তে থাকে কন্যা ভ্রূণের মিছিল
আর যারা আরো আরো আগে হেঁটেছিলেন
তাঁরাও এসে দাঁড়ান সামনে।
আমি নতজানু হয়ে বসে আছি সেই বিরাটের কাছে।
আসলে কিছু পাল্টায় না -
যুগে যুগে সন্ত্রাসের টার্গেট তো নারী আর শিশু
পৃথিবী যত উন্নত হবে ততই বাড়বে হিংস্রতা।
আমিও প্রস্থান করে ওই দলে ভিড়ে
জবাবদিহি চাইবো এমন করে সেই শেষের দিনে।
স্বাতী। ১৬.১২.১৭

পাখির বাসা : স্বাতী বিশ্বাস



উপহার
গত কয়েকদিন যাবত একটা ঘোরের মধ্যে চলেছে। ক্যামন যেন ওলট পালট চারিধার।
খবরের কাগজে, টিভি চ্যানেলে চোখ রাখা দায়। খালি শিউরে ওঠা খবর! আমরা কেউ ভাল নেই! ভাল থাকা যায়না এভাবে!
তবুও কিছু কিছু খবর কিছুটা হলেও আশা জাগায়। গতকাল দেখলাম, ক্যান্সারের ওষুধ আবিস্কার করে ফেলেছেন আমাদের বৈজ্ঞানিকরা - যার জন্য এত বছর আমরা প্রতীক্ষা করেছি! অথচ এই খবরটাই তো শিরোনামে আসা উচিৎ! দায় কি শুধু সাধারণ মানুষের?
পৃথিবীতে আবার হোক সুন্দরের আরাধনা! আমরা মানুষ হই , সংবেদনশীল হই। আমার চারিপাশ ভাল না থাকলে আমিও ভাল থাকতে পারি না।
পুরানো যুগে ফেরার কথা বলছি না... নতুনদের সাথে নিয়ে পথ চলি। একা নয় একসাথে থাকার বীজটা আবার রোপিত হোক।
ঈশ্বর প্রতিটাদিন সুন্দর করে আমাদের কাছে পাঠান। সেটা আমরাই নষ্ট করি।
আবার শুরু করি নতুন করে... সহমর্মিতা, সহনশীলতা, ভালবাসা আবার ফিরিয়ে আনি...
আজ সকালে একটা সুন্দর উপহার পেলাম। একটা পাখি আমাদের ব্যালকোনি বাগানের টবে বাসা বানিয়েছিল। কিছুদিন বাইরে ছিলাম বলে যায়গাটা নির্জন হয়ে যায়। তখনই বাসা বানিয়ে নেয়। ফিরে এসে দেখি ডিম পেরেছে এক জোড়া। অপেক্ষায় ছিলাম ছানাদের দেখার। আজ সকালে দেখি ডিম থেকে দুটো ফুটফুটে ছানা! পাখি মা বাচ্চাদের কি সুন্দর খাইয়ে দিচ্ছে!

আমাদের শিশুদের আমরা কেন রক্ষা করতে পারি না! আপনার বাচ্চাকে যতদিন আমি নিজের সন্তানের মত না ভাবতে পারব ততদিন এই ঘুণপোকা মরবে না!
পাখির ভিডিও টি শেয়ার করলাম।

পরিবার
পাখির ছানাদের রোজ সকালে একবার দেখে অফিস যাই। গতকাল দেখি মা পাখি নেই। খাবার খুঁজতে গেছে বোধহয়। কিন্তু ওরা বলল যে, মা পাখি নাকি গতকাল থেকে আসেনি। এমনিতে মা পাখি বেরুলে বাবা পাখি এসে আওয়াজ করে ডেকে ছানাদের অভয় দেয়। প্রকৃতির কি সুন্দর ব্যবস্থা! এই পাখি পরিবারকে এত কাছ থেকে না দেখলে অজানাই থেকে যেত এত কিছু। সন্তানের জন্য ভালবাসা আর যত্ন মা বাবার মত আর কেউ নিতে পারে না।
গতকাল মা পাখিকে দেখতে না পেয়ে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ছানা গুলো না খেতে পেয়ে মরে যাবে যে। শেষে আমার সাহায্যকারিনি ভাত পেষ্ট করে ওদের বাসার কাছে রেখে দিলো। বাসা বলতে তো সেই রান্না ঘরের বারান্দার টব। ভাগ্যিস টব, তাইতো সব দেখতে পাচ্ছি। প্ৰথমে খেলো না। পরে খেয়ে নিয়ে দেখলাম ঠোঁট চাটছে। আজও তাই। মা পাখির দেখা নেই। ভাত দেয়া হল। বড় ছানাটি খেলো , ছোটটি নয়।
আমাদের তো কৌতূহলের শেষ নেই। বারবার দেখছি যে, এই বুঝি মা পাখি এল। কর্তা বেরোন নি আজ। দুপুরে ফোনে জানালেন যে বড় ছানাটি ডানা মেলে উড়ে গেছে কখন যেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখি ছোট একা ঘুমাচ্ছে।
মন খারাপ। ছোট পাখিটি তবে আর বাঁচলো না।
রাত আট টা নাগাদ গিয়ে দেখি মা পাখি আবার ফিরে এসেছে। একটা স্বস্তি পেলাম তবু। দেখা যাক কাল সকালে আবার কি দেখব।
ছোট পাখিটা উড়তে শিখে মিলিয়ে যাবে মুক্ত আকাশে। যতদিন না পারছে ততদিন কাকের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে।


সমাপ্তি
বাসা বানানো, ডিম পারা, ডিমে তা দেওয়া, ডিম ফেটে ছানা বেরুনো, ছানাদের খাওয়ানো, ছানাদের চোখের দৃষ্টি ঠিক হওয়া, পালাক্রমে বাবা পাখি আর মা পাখির ছানাদের দেখভাল করা।   স্পর্শ এবং মৃদু ডাকের মাধ্যমে ভাবের আদান প্রদান - এসব দেখেছি একের পর এক ।  অনুভব করেছি প্রতি মুহূর্তে এই পাখি পরিবারের ভালবাসা আর দায়বদ্ধতার মাধুর্য।
বড় ছানাটি আগেই উড়তে শিখেছিল। তবে একদম পালিয়ে যায়নি। প্রতিদিন দুপুরে এসে মা বাবার সাথে ছোট ছানাটিকে দেখে যেত।
মা গতকাল  ছানাটাকে উড়তে শেখাবার ট্রেনিং দিচ্ছিল। সে এক অপরূপ দৃশ্য। ছানার মুখের কাছে মা পাখি মুখ দিয়ে সঙ্কেত দিচ্ছিল আর ডানা ঝাপ্টাচ্ছিল। ওমা! একটু পরেই দেখি ছানা মায়ের সাথে সাথে ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। তবে উড়তে পারেনি।  কিছুক্ষন পরে দেখলাম মা নেই। কিন্তু ছানাটি মাঝে মাঝেই প্র্যাকটিস করে চলেছে।

রোববার বলে বাড়িতে ছিলাম গতকাল। তাই মাঝে মাঝেই বারান্দায় গিয়ে দেখে এসেছি। সন্ধ্যা বেলায় মা পাখি আবার ছানার কাছে ফিরে এসেছিল। রাতের দিকেও দেখেছি।

আজ সকালে বারান্দায় গিয়ে দেখি  ওরা কেউ নেই। বাসা ফাঁকা। গতকালের প্র্যাকটিস ছোট ছানাটিকে উড়তে সাহায্য করেছে। নিশ্চয় মা পাখি গতকাল ছোটটিকে তা ই শেখাচ্ছিল যে উড়তে শেখা মাত্রই এখান থেকে চলে যেতে হবে মুক্ত আকাশে।